তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষকভক্তির অনন্য কাহিনি

আলী আকবর : তখন ১৯৭৬ সাল। সবেমাত্র প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে কাপাসিয়ার তরগাঁওয়ের ঈদগাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।

বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে বিদ্যালয়। তখনো স্কুল ব্যাগের প্রচলন হয়নি। রুমালে একগাদা বই বেঁধে বগলে চেপে হইহুল্লোড় করে সহপাঠীদের সাথে রওনা দিতাম।

পথিমধ্যে ধলেগর খাল। এই খালের কূল ঘেঁষে বিদ্যালয়ের রাস্তা। কিছু দূর অতিক্রম করলেই রাস্তার ধারে একটি সৌখিন বাড়ি।

বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার সময় প্রায়ই লক্ষ্য করতাম, এক বৃদ্ধ বয়সী গুরুগম্ভীর লোক বাড়ির দক্ষিণের বাংলোতে বসে খবরের কাগজ কিংবা বই পড়ছেন।

আবার কখনো বা আমাদের বিদ্যালয় গমনের দৃশ্য অবলোকন করতেন। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত ভদ্র লোকটির হাতে থাকত চলার সহায়ক একটি লাঠি।

একটি ছাতাও ব্যবহার করতেন সব সময়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে ভর করা লাঠিটির ন্যায় ছাতাটিও ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী।

গাঁয়ের মেঠোপথ দিয়ে যখন তিনি হাঁটতেন, অসংখ্য আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তাকে সালাম দিতেন। কেউ বা নতজানু হয়ে পা ছুঁয়ে ভক্তি করতেন।

পরম স্নেহে কাউকে কাউকে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরতেন। তার প্রতি এ অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভক্তির দৃশ্য শৈশবে আমার কচি মনকেও অভিভূত করত।

ভাবতাম, বড় হয়ে আমিও যদি তার মত এমন সম্মানের পাত্র হতে পারতাম!

প্রিয় পাঠক, বলছিলাম মানুষ গড়ার কারিগর মফিজ উদ্দিন স্যারের কথা। তিনি ছিলেন কাপাসিয়ার গর্ব তথা বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের স্কুল শিক্ষক।

বর্তমান কাপাসিয়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ছিল তৎকালীন এম ই উচ্চ বিদ্যালয়। মফিজ স্যার ছিলেন মাইনর স্কুলের শিক্ষক।

পিতা ইয়াসিন খানের কাছ থেকে আরবি শেখার পর শৈশবে তাজউদ্দীন আহমদ ভর্তি হন বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ভূলেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করার পর ভর্তি হন মাইনর স্কুলে। অসাধারণ মেধা আর প্রতিভার গুণে নজর কাড়েন শিক্ষকদের।

বাদ পড়েননি মফিজ স্যারও। শ্রেণি শিক্ষক হিসেবে একটু বেশি আদর-স্নেহ করতেন সেই দিনের তাজউদ্দীন আহমদকে।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বাবার কাছ থেকে যেদিন জানলাম মফিজ স্যার বঙ্গতাজের শিক্ষক, সেদিন থেকে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা-ভক্তির মোহ আরও বেড়ে গেল।

ইচ্ছে হল তার সান্নিধ্যে যাওয়া। এক দিন বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। জানুয়ারি মাস, শীতের সকাল। লক্ষ্য করলাম, তিনি পড়ার ঘরের সামনে রোদে চেয়ারে বসে পড়ছেন।

সামনে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম। স্নেহ করে তিনি আমাকে পাশে থাকা একটি চৌকিতে বসতে দিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, মানুষ বুড়ো হলে যাকে কাছে পায়, তার কাছে অতীত স্মৃতি সুধায়। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই হল।

তিনি শুরু করলেন জীবনের স্মৃতি, সাফল্যগাঁথা ও অতীত কথা! আমি তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। অনেক কথার পর শুনালেন জীবনের অনবদ্য কাহিনি। যা হয়তো বা অনেকের অজানা।

তিনি বললেন, দেশ স্বাধীনের পর এক কাজে ঢাকা গেলাম। উদ্দেশ্য ছিল, তাজউদ্দীনের সাথে দেখা করা। তাজউদ্দীন তখন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী।

বাসায় গিয়ে শুনলাম, তাজউদ্দীন বাসায় নেই। পুরাতন সংসদ ভবনে বিশেষ মিটিংয়ে আছে। আমি রিকশায় করে সেখানে গেলাম।

কিন্তু সংসদ ভবনের কর্তব্যরত পুলিশ কিছুতেই আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর তাদের একজনকে ডেকে চুপিসারে বললাম, আমি তাজউদ্দীনের শিক্ষক। বিশেষ প্রয়োজনে দেখা করতে এসেছি। আমি এসেছি, অন্তত এ খবরটা ওর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন।

পুলিশ আমার কথা শুনল। যে পুলিশ আমাকে ঢুকতে দেয়নি, সেই পুলিশই কিছুক্ষণ পর এসে আমাকে স্যালুট দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল।

কক্ষে ঢুকে দেখলাম, মিটিং চলছে। আমাকে দেখামাত্র তাজউদ্দীন আসন ছেড়ে এগিয়ে এল। শ্রদ্ধাবনত হয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করল।

এ দৃশ্য দেখে অন্য সবাই দাঁড়িয়ে গেল। আমি সেই দিনের শিক্ষকভক্তির স্মৃতি জীবনে কখনো ভুলতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল, সেই দিন আমার সিনা (বুক) সাত আসমান তব গর্বে ভরে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, মনে হয়েছিল, শিক্ষক হয়ে আজ আমি সত্যিই ধন্য। সহস্র ভালবাসা আর স্নেহের পরশ শুধু তাজউদ্দীনের জন্য, যে আমার মাধ্যমে শিক্ষক মর্যাদার এক অনন্য নজির স্থাপন করল।

লক্ষ্য করলাম, অতীত স্মৃতি রোমন্থন করে স্যার অনেকটা আবেগাল্পুত হয়ে উঠলেন। অতঃপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ঐ কবিতার লাইনগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে?

আমি বললাম, কোনটি স্যার? মফিজ স্যার তখন নিজেই আবৃত্তি করে শুনালেন-

‘‘আজ হতে চির উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির

সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশা আলমগীর।’’

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গাজীপুর জেলা শাখা।

e-mail : [email protected]

image_printপ্রিন্ট করুন
Share
  • 798
    Shares
আরও খবর