গাজীপুরে রাণী বিলাসমণির ‘কোচিংবাজ’ শিক্ষকদের বাণিজ্য জমজমাট

আলোকিত প্রতিবেদক : গাজীপুর মহানগরীর রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বেপরোয়া কোচিং বাণিজ্য ও কর্তৃপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনায় অতীত সুনাম ডুবতে বসেছে।

খোদ জেলা প্রশাসক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে দুরবস্থার প্রতিকার হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাণী বিলাসমণির প্রধান শিক্ষক নাজিমুদ্দিন সরকার নিজের খেয়াল-খুশিমত বিদ্যালয় চালাচ্ছেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে এই বিদ্যালয়ে আছেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হয়ে পদোন্নতি পান।

তার মদদ পেয়ে কোচিংবাজ শিক্ষকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অভিভাবকরা এক প্রকার বাধ্য হয়ে সন্তানদের কোচিংয়ে দিচ্ছেন।

ইংরেজি বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষক আসাদুজ্জামান নূর রাণী বিলাসমণিতে আছেন ২০১৬ সাল থেকে। এর আগে স্কুলে দলাদলি করায় ২০০৯ সালে তাকে মানিকগঞ্জে বদলি করা হয়। ২০১১ সালে তিনি আবার এখানে আসলে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি।

পরে জয়দেবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কালীগঞ্জ হয়ে রাণী বিলাসমণিতে আসেন। প্রায় দেড় যুগ ধরে রাজদীঘির পশ্চিম পাড়ের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজার ডরমিটরি তার দখলে রয়েছে।

সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন বাসা কাম কোচিং সেন্টার। তার অঘোষিত কোচিং সেন্টারে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী প্রায় ১০০ জন। ছাত্রপ্রতি ১৫০০ টাকা করে মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।

আসাদুজ্জামান নূর সরকারি স্থাপনায় বসবাস করলেও এত দিন নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করেননি। তিনি কৌশলে সরকারকে লাখো টাকা ফাঁকি দিয়েছেন।

বিষয়টির ওপর ২০১৭ সালে আলোকিত নিউজে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তখন কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়।

এ ব্যাপারে শিক্ষক আসাদুজ্জামান নূরের সাথে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কল ধরেননি।

রাজদীঘির পাড়ে কোয়ার্টারে বসবাস করে কোচিং করান জীববিজ্ঞানের সিনিয়র শিক্ষক মনির হোসেন। তিনি রাণী বিলাসমণিতে আছেন ২০০৬ সাল থেকে।

তার কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থী অর্ধশত। ছাত্রপ্রতি ১৫০০ টাকা করে মাসে পৌনে এক লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষক মনির হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ক্লাসে আছেন বলে জানান। ছুটির পর কল করলে আর ধরেননি।

ইংরেজির সহকারী শিক্ষক মোজাম্মেল হক মোল্লা রাণী বিলাসমণিতে আছেন ২০১০ সাল থেকে। এখানেই তার চাকরির প্রথম পোস্টিং। তিনি আগে জোড়পুকুর কাঁচা বাজারের উত্তরে স্টার ফ্রলিক স্কুলের বিপরীত পাশের আলভী ভিলার নিচ তলায় রুম ভাড়া নিয়ে কোচিং করাতেন। পরে উত্তর ছায়াবীথিতে স্থান পরিবর্তন করেন।

তার কোচিং সেন্টারে বর্তমানে শিক্ষার্থী অর্ধশত। আগে শিক্ষার্থী ছিল শতাধিক। ছাত্রপ্রতি ১৫০০ টাকা করে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষক মোজাম্মেল হক মোল্লার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই সংযোগ কেটে দেন।

ভূগোলের সিনিয়র শিক্ষক আসাদুজ্জামান শিবলী রাণী বিলাসমণিতে আছেন ২০০৫ সাল থেকে ও ইংরেজির সিনিয়র সহকারী শিক্ষক জসীম উদ্দিন খান আছেন ২০১১ সাল থেকে। তারা জোড়পুকুর রোডের টাঙ্গাইল শাহীন স্কুলের পূর্ব পাশের গলিতে অ্যাডভোকেট হযরত আলীর বাড়ির নিচ তলার দক্ষিণ ও উত্তর পাশের রুম ভাড়া নিয়ে কোচিং করান।

আসাদুজ্জামান শিবলীর কোচিংয়ে শিক্ষার্থী পৌনে ১০০ জন ও জসীম উদ্দিন খানের কোচিংয়ে অর্ধশত। ছাত্রপ্রতি ১৫০০ টাকা করে আসাদুজ্জামান শিবলীর মাসে লক্ষাধিক ও জসীম উদ্দিন খানের পৌনে এক লাখ টাকার বাণিজ্য হচ্ছে।

এ ব্যাপারে শিক্ষক আসাদুজ্জামান শিবলী আলোকিত নিউজকে বলেন, অভিযোগ সত্য নয়। আমি বহু বছর যাবত পড়াই না।

আর শিক্ষক জসীম উদ্দিন খানের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলতে বলেন।

এ ছাড়া শাহীন স্কুলের গলিতে এক শিক্ষা কর্মকর্তার বাড়ির নিচ তলায় রুম ভাড়া নিয়ে কোচিং করান ইংরেজির সিনিয়র শিক্ষক মাহবুব আলম। তিনি বড় কোচিংবাজ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।

মাহবুব আলম রাণী বিলাসমণিতে আছেন ২০১০ সাল থেকে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসা সংক্রান্ত ছুটিতে ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থান করছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১২ সালে জারিকৃত নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি সুবিধাভোগী শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষার্থীকে বাসা বা বাইরে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়াতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জনকে পড়ানো যাবে। এই বিধান অমান্য করলে এমপিও স্থগিত বা সাময়িক বরখাস্তসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষকদের কোচিং সারা বছর ধরে কম-বেশি চলে। তাদের কাছে না পড়লে নানাভাবে চাপ দেওয়া হয়। পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ার ভয় বেশি থাকে।

একাধিক শিক্ষক জানান, আলোচিত শিক্ষকদের বাইরেও কয়েকজন শিক্ষক কোচিংয়ের সাথে জড়িত। এক যুগ বা দেড় যুগ পরও বদলি না করায় তারা অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছেন। আবার কেউ কেউ বদলি হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে তদবির করে আবার চলে আসেন।

তারা আরও জানান, জেলা প্রশাসক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি থাকায় জেলা শিক্ষা অফিস এসব কর্মকাণ্ড জেনেও উদাসীন থাকে। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কর্তাব্যক্তিদের সমন্বিতভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এদিকে রাণী বিলাসমণিতে ষষ্ঠ শ্রেণির প্রভাতী ও দিবা শিফটে ১৮০ জন করে মোট শিক্ষার্থী ৩৬০ জন। গত জুনে হঠাৎ প্রতি শিফটের তিনটি শাখাকে দুটি করা হয়।

শিক্ষার্থীরা জানায়, এখন প্রতি শাখায় ৬০ জনের বদলে ৯০ জন করে পাঠদান হচ্ছে। এতে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাসহ বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দিয়েছে।

জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক নাজিমুদ্দিন সরকার আলোকিত নিউজকে বলেন, স্কুলে আসেন, সাক্ষাতে কথা বলি। আমরা তো সরকারি চাকরি করি, মতামত দিতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে দিতে হবে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা আলোকিত নিউজকে বলেন, কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ পাইনি। ডিজি অফিস থেকে একজন ছাত্রকে পেটানোর অভিযোগের তদন্ত চলছে। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) হুমায়ুন কবিরের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি আলোকিত নিউজকে বলেন, এখন আরেকটি অভিযোগের তদন্ত চলছে। কোচিং বাণিজ্যের তথ্য দিলে ব্যবস্থা নিব।

আরও খবর